ইতিহাস বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

সার্জারির আবিষ্কারক ছিলেন মুসলিম চিকিৎসক আল-জাহরাভি

  • 1.5K
  •  
  •  
  •  
    1.5K
    Shares

বি.বি নিউজ ডিজিটাল ডেস্কঃ প্রাচীনকাল থেকে জ্ঞান বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে মুসলিম মনীষীদের অবদান অনস্বীকার্য। মধ্যযুগে সভ্য-পৃথিবী বিনির্মাণে তাদের ভূমিকা অকুণ্ঠভাবে স্বীকৃত। কর্ডোভার সোনালি যুগে বিখ্যাত শল্যচিকিৎসাবিদ আবুল কাসিম আল-জাহরাভির পৃথিবীকে উপহার দেন তার শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ ‘আত-তাসরিফ’। শল্যচিকিৎসায় আল-জাহরাভি কেমন পারদর্শী ও অভিজ্ঞ ছিলেন গ্রন্থটি এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

চিকিৎসক আল-জাহরাভির জন্ম ও বেড়ে ওঠা
পুরো নাম আবুল কাসিম খালাফ ইবনুল আব্বাস আল-জাহরাভি। জাহরাভির জন্ম স্পেনের কর্ডোভার শহরতলীর প্রধান অংশ আল-জাহরায়। কারো মতে তিনি ৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে ‘মদিনাতুজ জাহরা’য় জন্মগ্রহণ করেন। প্রসঙ্গত স্পেনের তৃতীয় খলিফা আবদুর রহমান আন-নাসির লিদিনিল্লাহ (৯৮৯-৯৬১ খ্রি) তার প্রিয়তমা ও মহীয়সী আল-জাহরার ইচ্ছানুসারে এই অপূর্ব সুন্দর নগরী নির্মাণ করেন। (আলী আশ-শাতশাত, তারিখুল জারাহা ফি-ত্তিব্বিল আরবি: ১/৭৫ দ্রষ্টব্য)

ইউরোপে আল-জাহরাভি আল-বুকাসিস (Albucasis), বুকাসিস (Bucasis) ও আল-য়্যারভিয়াস (Alyaharvious) নামে পরিচিত। জাহরাভির পিতা-মাতা স্পেনের অধিবাসী ছিলেন।

সর্বপ্রথম শল্যবিদ্যা প্রচলন করেন জাহরাভি

আবুল কাসিম আল-জাহরাভি কর্ডোভার বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন শাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা ও চিকিৎসা শাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। শিক্ষা শেষে জাহরায় চিকিৎসাসেবা শুরু করেন।

শল্যচিকিৎসায় প্রথম থেকেই তিনি আশ্চর্যজনক সফলতা লাভ করেন। ফলে দ্রুত সবদিকে তার সুনাম-সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। সফলতার স্বাক্ষর হিসেবে খলিফা আবদুর রহমান ও খলিফা আবুল হাকাম—উভয়েরই চিকিৎসক হিসেবে নিযুক্ত হন। কর্ডোভার বিখ্যাত হাসপাতালের প্রধান চিকিৎসক হিসেবেও নিয়োগ পান তিনি। তার ভুবনবিখ্যাত চিকিৎসাগ্রন্থ ‘আত-তাসরিফ’র মতো বিষয়বস্তু ও তত্ত্বনির্ভর এতো চমৎকার গ্রন্থ তৎকালীন যুগে আর কেউ লিখেনি। (ইবনে হাজাম, ফাদায়েলু আহলিল আন্দালুস: ২/১৮৫)

শল্যচিকিৎসা বিভাগের প্রভূত সংস্কার ও উন্নতি সাধন করেন। শেষ জীবনে আবুল কাসিম সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেন। জীবনসায়াহ্নে তিনি চিকিৎসাগ্রন্থ প্রণয়নে মনোনিবেশ করেন। বিভিন্ন মতামত অনুসারে ১০১৩ খ্রিস্টাব্দে আল-জাহরাতে তিনি ইন্তিকাল করেন। তার মৃত্যুর পর তার যশ-খ্যাতি অত্যধিক হারে স্পেন থেকে প্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

তার ব্যাপারে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও গবেষকরা বলেছেন, জাহরাভি স্পেনের আরব চিকিৎসাবিদদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ শল্যবিদ ছিলেন। (ইবনু আবি উসাইবা, উয়ুনুল আনবা ফি তাবাকাতিল আতিব্বা, পৃষ্ঠা: ৫০১; ঐতিহাসিক হিট্টিও জোরালোভাবে এই মত ব্যক্ত করেন।)

ব্যক্তিজীবনে জাহরাভি ছিলেন সাদাসিধে ও ‘অল্পে তুষ্টি’ প্রকৃতির। চিকিৎসাবিদ্যা ও ঔষধ তৈরি ইত্যাদির প্রতি ভীষণ ঐকান্তিক ছিলেন। গরিব-দুঃখী ও অসুস্থদের সেবায় নিজের অধিকাংশ সময় ব্যয় করতেন। (মুহাম্মদ শাবান আইয়ুব, আবুল কাসিম আল-জাহরাভি, মাজা তারিফু আন আলমি জার্রাহিল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা?, আল-জাজিরা অ্যারাবিক, ২৫/০৮/২০১৯)

আল-জাহরাভির রচনা-সম্ভার
পদার্থ, রসায়ন ও চিকিৎসা শাস্ত্রের উপর আল-জাহরাভি বিশটি গ্রন্থ রচনা করেন। কিন্তু পদার্থ ও রসায়নের উপর রচিত গ্রন্থ তাকে শ্রেষ্ঠত্বের সোপানে পৌঁছাতে সক্ষম হয় নি। চিকিৎসাবিষয়ক গ্রন্থগুলোই তৎকালীন শ্রেষ্ঠ চিকিৎসকের মর্যাদা দেয়। তার পদার্থ ও রসায়ন সংক্রান্ত গ্রন্থাবলী সম্পর্কে আলোচনা তেমন পাওযা যায় না।

চিকিৎসাবিষয়ক যে গ্রন্থটি তাকে শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি দিয়েছে সেটি হলো ‘কিতাবুত তাসরিফ লিমান আজিযা আনিত তা’লিফ। এই গ্রন্থটি ৩০টি অধ্যায়ে শিক্ষাগত (Educational) ও কার্যকরী (Effective) বিস্তৃত। প্রথম খণ্ডে এনাটমি (Anatomy), ফিজিওলজি (physiology) ও ডায়াটেটিকস (Dietetics) নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। (বিস্তারিত দেখুন: আবদুল মওদুদ, মুসলিম মনীষা, পৃষ্ঠা: ৭৯)

দ্বিতীয় খণ্ডে বিশেষত সার্জারি (Surgery) সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে। গ্রন্থটিকে অধ্যাপক সারটন ‘Medical Encyclopedia’ নামে অভিহিত করেছেন। এর চিকিৎসার অংশের চেয়ে সার্জারীর অংশ সর্বদিক দিয়ে উন্নত ও মৌলিকতার পরিচায়ক হলেও চিকিৎসার অংশেও মৌলিকতার অভাব নেই। ঔষধ তৈরি করতে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ অনুসরণে পতন (Distillation) ও ঊর্ধ্বপাতন (sublimation) প্রথা প্রয়োগ করেছেন। (বিস্তারিত দেখুন: আবদুল মওদুদ, মুসলিম মনীষা, পৃষ্ঠা: ৭৯-৮০)

এসব দিক বিবেচনায় গ্রন্থটিকে অভিনব বলা চলে। এছাড়াও গ্রন্থটির দ্বিতীয় খণ্ডে বা কার্যকরী-সার্জারি অংশে রয়েছে অভূতপূর্ব বৈশিষ্ট্যবলী।

প্রথম সার্জারির প্রচলন করেন জাহরাভি
ঐতিহাসিকদের মতে জাহরাভিই সর্বপ্রথম চিকিৎসক যিনি ইউরোপে বৈজ্ঞানিক প্রথায় সার্জারির প্রচলন ও এর বিশদ বিবরণ প্রচার করেন।

সার্জারি খণ্ডের বিশেষত্ব হলো- এর মধ্যে সাধারণ চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে বিশেষ কোনো আলোচনা করা হয়নি, ফলে এটা এমনিতেই পরিপূর্ণ বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ খ-টি পৃথকভাবে চিত্রাদিসহ প্রকাশিত হয়। ডা. ক্যাম্পবেলের মতে, ‘এ হলো এ বিষয়ের সর্বপ্রথম স্বাধীন সচিত্রগ্রন্থ” (The first independent illustrated book on the subject) (আবদুল মওদুদ, মুসলিম মনীষা, পৃষ্ঠা: ৭৮)

জিরাল্ড কর্তৃক ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ
‘আত-তাসরিফ’ গ্রন্থের সার্জারী খণ্ডটি জিরাল্ড ল্যাটিন ভাষায় মূল আরবিসহ প্রকাশ করেন। ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করে গ্রন্থটির নাম দেন ‘De Chirurgia’। এটি সালার্নো ও মন্টেপেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তক হিসেবে কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। (আকবর আলী, বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান, পৃষ্ঠা: ৩৩৮)

এ গ্রন্থে ২০০ প্রকার সার্জারির যন্ত্রপাতির নমুনা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। গ্রন্থটি ইউরোপে কি পরিমাণ মর্যাদা লাভ করেছে, তা এর বারবার অনুবাদ থেকেই বোঝা যায়। ডা. ক্যাম্পবেলের মতে, গ্রন্থটি পরপর পাঁচবার ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়। আর একথা সর্বসম্মত যে, তার এ গ্রন্থের প্রভাবেই ইউরোপে সার্জারির মান বিশেষভাবে উন্নীত হয়। (আবদুল আজিম আদ-দায়েব, আবুল কাসিম আল-জাহরাভি; আওয়ালু তাবিবিন –জার্রাহ- ফিল আম, পৃষ্ঠা: ৫৭)

আল-জাহরাভির চিকিৎসা। জাহরাভির সচিত্র গ্রন্থের যে কয়েকটি পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায়, তন্মধ্যে দুইটি রয়েছে অক্সফোর্ডের বডলিয়েন (Bodleian) লাইব্রেরিতে এবং অন্য একটি রয়েছে গোথাতে। জিরাল্ডের ল্যাটিন অনুবাদের একটি পাণ্ডুলিপি রয়েছে প্যারিসে। এতে তিনি গ্রন্থকারের নাম দিয়েছেন Abul Casim। কিছু পাণ্ডুলিপি ফ্লোরেন্স, ব্যামবার্গ, ফ্রাঙ্কয়েস, মন্টেপেলিয়ার, লিডেন ও ডেনিস রক্ষণাগারে সুরক্ষিত আছে। (আবদুল মওদুদ, মুসলিম মনীষা, পৃষ্ঠা: ৮০)

মেডিসিন বা ঔষধ বিষয়ে তার অবদান
সার্জারির ক্ষেত্রে এই মহান মনীষীর অপরিসীম ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী সাফল্য হলেও মেডিসিন বা ঔষধ বিষয়েও যথেষ্ট অবদান পাওয়া যায়। তিনি কুষ্ঠরোগ ও এর প্রতিকার সম্বন্ধে তাঁর গ্রন্থে আলোচনা করেছেন। তিনি অবস্থা বুঝে এ রোগের চিকিৎসা করতেন। এ রোগ সম্বন্ধে তার আগে আর কোনো বিজ্ঞানী এমন বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন বলে জানা যায় না। (আবদুল আজিম আদ-দায়েব, আবুল কাসিম আল-জাহরাভি; আওয়ালু তাবিবিন –জার্রাহ- ফিল আম, পৃষ্ঠা: ৫৭-৫৮)

শিশুরোগের চিকিৎসায় জাহরাভি
জাহরাভি শিশু রোগের চিকিৎসাতেও কিছু কিছু অভিনব পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। তিনি শিশু রোগের চিকিৎসার জন্য মাতৃস্তন থেকে দূষিত দুধ চুষে বের করার পরিবর্তে এর জন্য এক প্রকার যন্ত্র আবিষ্কার করেন। শিশুদের রিকেট হবার কারণ এবং এর প্রতিকারেরও এক অভিনব পন্থা উদ্ভাবন করেছিলেন। তিনি শিশুদের মেরুদণ্ড বাঁকা হওয়ার কারণ সম্বন্ধে পূর্বেকার সব মতের ওপর নতুন মত প্রকাশ করেন। (আকবর আলী, বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান, পৃষ্ঠা: ৩৩৯)

কিতাবুত তাসরিফ গ্রন্থ ব্যতীত জাহরাভির অন্য যে কটি গ্রন্থের নাম পাওয়া যায় সেগুলো হলো-

আল-জাওযুত তাম্মি ফি ইলমিত তিব্বি ওয়াত তাসরিহি ওয়া আলয়িরি জালিকা;
মাকালাতু তাকাসিমুল আমরাদ;
তাফসিরুল মাওজুদ ফি ক্বালবিত তিব্বি বিইখতিলাফি আসমায়ি মারবিল হুরুফিল মুজামা;
আল-মাকালাতু ফি আমালিল জাসাদি;
মাকালাতুন ফি আমরিল আকাফিরিল মুফরাদাতি ওয়াল মুরাক্কাবাত।

মুসলমানদের মধ্যে আবুল কাসিম জাহরাভি ছিলেন শল্যচিকিৎসার প্রাণপুরুষ। তিনি তার মেধা, মননশীলতা, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও অনুশীলনের মাধ্যমে বিষয়টিকে প্রায় পূর্ণতার কাছাকাছি নিয়ে আসেন। শল্যচিকিৎসা ও বিদ্যাজগতে মুসলমানরা পূর্বসূরীদের অপরিসীম কৃতিত্ব ও অবদানের কথা অবহিত করতে পারেন অন্যদের। আবুল কাসিম জাহরাভির শিক্ষা ও অবদান মাইলফলক হতে পারে অনেকের জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *